“মায়ের ভাষা বলছি বলে আজকে বাংলাদেশি”: ভারতে বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে ফুটবল মাঠে তীব্র প্রতিবাদ

নিজেস্ব প্রতিবেদক

ছবি : সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষাকে “বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা” বলে চিহ্নিত করার প্রতিবাদে ফুটবল মাঠে সরব হলো ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থকরা। গতকাল ডুরান্ড কাপের ম্যাচে দর্শকদের বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল— “ভারত স্বাধীন করতে সেদিন পরেছিলাম ফাঁসি/ মায়ের ভাষা বলছি বলে, আজকে বাংলাদেশি”। এই প্রতিবাদ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতজুড়ে বাঙালি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে একটি জোরালো বার্তা দিয়েছে ।

গত কয়েক মাস ধরে ভারতের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে ‘বাঙালি বিদ্বেষ’ বাড়ছে। বহু বাঙালি শ্রমিককে বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে দিল্লি পুলিশের একটি অফিসিয়াল চিঠিতে বাংলা ভাষাকে “বাংলাদেশিদের ভাষা” বলে উল্লেখ করা হয়, যা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে ।

বিজেপির আইটি সেল প্রধান অমিত মালব্য এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি বিতর্কিত পোস্ট করে দাবি করেন, “বাংলা বলে কোনো ভাষাই নেই। বাঙালি একটি জাতিসত্তা, ভাষাগত অভিন্নতা নয়। দিল্লি পুলিশের ‘বাংলাদেশি ভাষা’ উল্লেখ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত করার জন্য, এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীর কোনো সম্পর্ক নেই।” এই মন্তব্যকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় “অপমানজনক, দেশবিরোধী ও অসাংবিধানিক” বলে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন ।

এই পরিস্থিতিতে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থকরা ডুরান্ড কাপের ম্যাচে বিশাল ব্যানার তুলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার বার্তা দেন। ব্যানারে লেখা বক্তব্য সরাসরি ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাস কে স্মরণ করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া বাঙালিরা আজ আবারও ভাষার পরিচয়ে “বাংলাদেশি” বলে চিহ্নিত হওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে ।

এ ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “বাংলা শুধু বাংলাদেশের ভাষা নয়, এটা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের কোটি মানুষের মাতৃভাষা। এই বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা দেশভাগের মনোভাবকে উসকে দিচ্ছে।”
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (সিপিআইএম নেতা) বলেন, “বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা বলার অর্থ হলো ভারতের সংবিধানকে অস্বীকার করা।”সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “ভাষা কোনো সীমানা চেনে না। বাংলা বিশ্বের ৩০ কোটি মানুষের ভাষা।”

ইস্টবেঙ্গল ক্লাব এফসিকে-কে ১-০ গোলে হারিয়ে ডুরান্ড কাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। তবে ম্যাচের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সমর্থকদের এই প্রতিবাদী বার্তা, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। #বাংলাভাষা_আমার_অহংকার ট্রেন্ড করছে টুইটারে ।

ভাষা কখনোই শুধু শব্দের সমষ্টি নয়— এটা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ধারক। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আজ ফুটবল মাঠ থেকে শুরু করে রাজপথে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: “বাংলা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটা সমস্ত বাঙালির গর্ব।” এই প্রতিবাদ শুধু একটি রাজ্যের নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাভাষী মানুষের সংহতিরই প্রতীক ।

সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ